সিলেটের ওসমানীনগরের মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬০ লাখ টাকার হিসাব চেয়ে অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন ২০ জন আজীবন দাতা সদস্য মনোনয়ন ও তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এর মধ্যে তদন্ত চলাকালে পাল্টা অভিযোগ দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
স্থানীয় ও প্রবাসীদের উদ্যোগে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে পরিচালনা কমিটির কর্তৃত্ব, দাতা সদস্য নির্বাচন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অ্যাডহক কমিটিকে না জানিয়ে ২০ জনকে আজীবন দাতা সদস্য মনোনীত করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁদের তালিকা বিদ্যালয়ে টানানো হলেও পরে তদন্তের সময় সেখানে শুধু সাধারণ দাতা সদস্যদের তালিকা পাওয়া গেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন, প্রধান শিক্ষককে শোকজ
বিদ্যালয়ের অর্থের হিসাব প্রকাশের দাবিতে ২৮ সেপ্টেম্বর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ সেপ্টেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদিউজ্জামান আহমদ। কমিটির সদস্যরা হলেন সিকন্দরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিপন সূত্রধর, কেএ জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মামুনুর রশিদ এবং নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষক রণধীর মোহন দেবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি ১১ অক্টোবর লিখিত জবাব দেন। তবে তাঁর জবাবে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।
তদন্ত কমিটির সদস্য মামুনুর রশিদ জানান, ১০ অক্টোবর তাঁরা বিদ্যালয় পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হবে। পরিদর্শনের সময় বিদ্যালয়ে শুধু দাতা সদস্যদের তালিকা পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ৮ অক্টোবর পাল্টা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদিউজ্জামান আহমদ জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
দাতা সদস্যের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৩ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনায় অ্যাডহক কমিটি গঠনের পরও ওই কমিটিকে না জানিয়ে নতুন ২০ জন আজীবন দাতা সদস্য মনোনীত করা হয়। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি আব্দুল মন্নান ও তাঁর স্ত্রী, সদস্য মাসুক আলী ও তাঁর পিতা এবং আব্দুস সালাম ও তাঁর স্ত্রীর নাম রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আমিনুল হক রিপন, আব্দুল করিম ও সাবেক প্রধান শিক্ষক আবুল লেইসকে আজীবন দাতা সদস্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত কমিটি গঠনের পর তালিকা সরিয়ে শুধু দাতা সদস্যদের তালিকা টানানো হয় বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
তবে নতুন সদস্যদের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, অর্থ বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হয়েছে কি না এবং তালিকা পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাবেক সভাপতির পাল্টা অভিযোগ
বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামছুল ইসলাম শামীমের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কাগজপত্র গায়েব করে আজীবন দাতা সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, অর্থের হিসাব চাওয়ার পর তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দিয়ে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনি প্রতিকার নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক রণধীর মোহন দেব বলেন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে আজীবন দাতা সদস্য নির্বাচন করা হবে। তালিকা কে সরিয়েছেন, তা তাঁর জানা নেই।
পরিচালনা কমিটি নিয়েও বিরোধ
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিচালনা কমিটির পদ-পদবি ও কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালে সভাপতি ছিলেন আব্দুল খালিক এবং প্রধান শিক্ষক ছিলেন আবুল লেইস। ২০২১ সালে আব্দুল খালিক যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার পর ইউপি সদস্য শামছুল ইসলাম শামীম ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন।
২০২৪ সালের জুনে প্রধান শিক্ষক আবুল লেইস ছুটি নিয়ে কানাডা গেলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান বশির মিয়া। অভিযোগ রয়েছে, তিনি পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে না জানিয়ে হারুন মিয়াকে সভাপতি করেন এবং নিজের মনোনীত একজনকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেন। আবুল লেইস দেশে ফিরে তাঁর স্থলে অন্য একজনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেখে আবার প্রবাসে চলে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছানা উল্লা চলতি বছরের শুরুতে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছাড়েন। এরপর প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান রণধীর মোহন দেব। এসব অভিযোগের বিষয়ে বশির মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয় পরিচালনায় যুক্তরাজ্য থেকে অর্থায়ন করা হলেও অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন কমিটির মধ্যে বিরোধের জেরে আরেকটি কমিটি গঠনের অভিযোগও উঠেছে। নতুন কমিটির তালিকা প্রকাশের সময় ৩০ থেকে ৪০ জন অভিভাবক, ভূমিদাতা ও দাতা সদস্য অনাস্থা জানিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠাকালীন বাস্তবায়ন ও পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন করে ফজল উদ্দিনকে সভাপতি, শিপন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক এবং নুরুজ্জামানকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান ও ভবন নির্মাণে আর্থিক সহায়তার বিষয়েও স্থানীয়দের বক্তব্য রয়েছে। তাঁদের দাবি, ফজল উদ্দিন ও আব্দুল খালিকের পরিবার এবং আব্দুল খালিকের ভাই আলাউদ্দিনের পরিবার বিদ্যালয়ের জন্য জমি দিয়েছে। শামছুল ইসলাম শামীমের দাবি, তাঁর পরিবার ৪১ শতক জমি দান করেছে এবং আত্মীয়স্বজনেরা প্রতিষ্ঠার পর দুই বছর বিদ্যালয়ের সব ব্যয় বহন করেছেন।
অর্থের হিসাব, আজীবন দাতা সদস্য নির্বাচন এবং বিদ্যালয় পরিচালনা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি এখন তদন্তের ফলের ওপর নির্ভর করছে।