অলিভ অয়েল কিনছেন ভেবে বোতল খুলে পাওয়া যাচ্ছে সয়াবিন তেল। পচা ফল দিয়ে তৈরি হচ্ছে জুস, বিদেশি প্রসাধনীর মোড়কে বিক্রি হচ্ছে নকল পণ্য। পোশাকের দোকানে ভুয়া মূল্যট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বড় ছাড়ের প্রলোভন। সিলেট নগরীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে এমন নানা অনিয়মের তথ্য পেয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই। গত কয়েক মাসে এসব অভিযানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা, পণ্য জব্দ এবং কয়েকটি বেকারি সিলগালা করা হয়েছে।
নগরীর বারুতখানার একটি বাসায় গুদামজাত করা হয়েছিল অলিভ অয়েল। চটকদার মোড়কে বোতলজাত এসব তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল বাজারের অভিজাত দোকানগুলোতে। তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। অলিভ অয়েলের বোতলে মূলত বিক্রি হচ্ছিল সয়াবিন তেল। আসল-নকলের পার্থক্য বুঝতে না পেরে ক্রেতারা বাড়তি দামে এসব তেল কিনছিলেন।
সম্প্রতি নগরীর কদমতলী ফলের আড়তে অভিযান চালান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরিফ মোর্শেদ মিশু। সেখানে বিক্রির জন্য পচা ফল আলাদা করে রাখা অবস্থায় দেখতে পান তিনি। আড়ত থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে উপশহরের এবিসি পয়েন্টে অভিযান চালানো হয়। পচা ফল ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে জুস তৈরির অভিযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। খাবারে কাপড়ের রং ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহারের দায়ে নগরের কয়েকটি রেস্টুরেন্টকেও জরিমানা গুনতে হয়েছে।
শুধু খাবার নয়, নকল পণ্যের বিস্তার দেখা গেছে প্রসাধনীর বাজারেও। নগরীর লালদিঘিরপাড় ও দক্ষিণ সুরমার যমুনা মার্কেটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল প্রসাধনী জব্দ করা হয়। নিম্নমানের এসব প্রসাধনী বিদেশি পণ্য হিসেবে বিক্রির অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। একইভাবে লালদিঘিরপাড় মার্কেটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল সিগারেট জব্দ করেছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
পোশাকের বাজারেও মিলেছে প্রতারণার অভিযোগ। কয়েক দিন আগে নগরীর পূর্ব জিন্দাবাজারে জোহা নামের একটি অভিজাত পোশাকের দোকানে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সেখানে ৭০০ টাকায় কেনা একটি পাঞ্জাবিতে ২৮০০ টাকার মূল্যট্যাগ লাগিয়ে ৭০ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি করতে দেখা যায়। সোলস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশি ট্যাগ ব্যবহার করে দেশি পোশাক বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়।
এদিকে দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলার ফেমাস মার্কেটে জেলা প্রশাসনের অভিযানের সময় কয়েকটি ফার্মেসির কর্মচারীরা দোকানের শাটার বন্ধ করে পালিয়ে যান। পরে সেসব ফার্মেসি থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও সরকারি ওষুধ জব্দ করা হয়।
খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নোংরা পরিবেশে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে খাদ্যসামগ্রী তৈরির দায়ে নগরের কয়েকটি লাইভ বেকারিকে জরিমানা করা হয়েছে। ভেজাল বিস্কুট ও ব্রেড তৈরির দায়ে কয়েকটি বেকারি সিলগালা করা হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক দেবানন্দ সিংহ বলেন, যেখানেই অভিযান চালানো হচ্ছে, সেখানেই কোনো না কোনো অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে। কেউ আসলের মোড়কে নকল পণ্য বিক্রি করছেন, কেউ ছাড়ের নামে প্রতারণা করছেন, আবার কেউ ক্ষতিকারক উপাদান মিশিয়ে খাবার তৈরি করছেন। অনেক সময় ক্রেতারা আসল-নকল পণ্য চিহ্নিত করতে পারেন না। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, খাবারে কাপড়ের রং, বিভিন্ন রাসায়নিক ও ভেজাল মসলা ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পড়ছে। এসব উপাদান মানবদেহে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে।