২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাত। সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে। পরদিন সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, ফাঁড়িতে রাতভর নির্যাতন করা হয়েছিল তাঁকে। ময়নাতদন্তেও তাঁর শরীরে মিলেছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।
সেই রাতের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার রায় এসেছে ছয় বছর পর। মামলার প্রধান আসামি ও তৎকালীন বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দুই কনস্টেবলের হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অপর তিন আসামিকে দেওয়া হয়েছে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড। তবে রায় ঘোষণার দিন ছয় আসামির মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্য একটি অভিযোগে তাঁকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন আদালত।
মামলার অপর দুই আসামি কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া এএসআই আশেক এলাহী, এসআই মো. হাসান উদ্দিন ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
রায়ের দিন কাঠগড়ায় অনুপস্থিতি
ছয় আসামির মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন শুধু এএসআই আশেক এলাহী। বাকি পাঁচজনের অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করা হয়। পলাতক আসামিরা হলেন এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুন অর রশিদ, টিটু চন্দ্র দাস, এসআই মো. হাসান উদ্দিন ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল নোমান।
আকবর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাঁর জামিন স্থগিত হলে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি আত্মসমর্পণ না করে আত্মগোপনে চলে যান। এসআই হাসান উদ্দিনও জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক হন। অন্যদিকে হারুন ও টিটু কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
ফাঁড়িতে নির্যাতন
রায়হানকে ফাঁড়িতে নেওয়ার পর কী ঘটেছিল, তা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল প্রশ্ন। তাঁর মৃত্যুর পর পুলিশ দাবি করেছিল, ছিনতাইয়ের অভিযোগে জনতা তাঁকে গণপিটুনি দিয়েছে। তবে পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে, ফাঁড়ির ভেতরেই তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
ময়নাতদন্তে রায়হানের শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯৭টি স্থানে ফোলা ও রক্তজমাট বাঁধার আলামত এবং ১৪টি স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর আঙুলের নখ উপড়ে ফেলার আলামতও পাওয়া যায়। আদালতের বর্ণনা অনুযায়ী, অতিরিক্ত নির্যাতনের প্রভাবে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্ত্রীর মামলা
রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৫ মে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় সংস্থাটি।
একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।
এদিকে রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার রাতে ফাঁড়ি থেকে ফোন করে তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরিবারের এক আত্মীয় টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে গেলে তাঁকে জানানো হয়, দেরি হয়ে গেছে এবং রায়হানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ছয় বছর পর মামলার রায় হয়েছে। তবে পাঁচ আসামি এখনো পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর করাই এখন বাকি।