৪ নভেম্বর ২০২৬, বুধবার

Jalalabad Today

VOICE OF THE VALLEY

ব্রেকিং

সিলেটে উড়ালসড়ক প্রকল্পের কাজ শুরু, স্বস্তিতে নগরবাসী ● রেমিট্যান্স প্রবাহে ঊর্ধ্বগতি, স্বস্তি ফিরছে অর্থনীতিতে ● আগামী সপ্তাহে শুরু হচ্ছে জাতীয় ক্রিকেট দলের নতুন সিরিজ ● ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুরু হয়েছে সচেতনতামূলক কর্মসূচি

অর্থনীতি আবহাওয়া ও পরিবেশ জাতীয় ব্যবসা সিলেট

যে উদ্যোগে বাড়বে চা উৎপাদন ও রপ্তানি

চা উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে ঋণের সুদ ১৩.৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, নতুন অর্থায়ন এবং চা বাগানের অনুপযোগী জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য চা শিল্পের আর্থিক চাপ কমিয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা।

গত মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে সরকার গঠিত মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চা খাতের আর্থিক সংকট মোকাবিলা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এখনো কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

ঋণের চাপ কমাতে একাধিক প্রস্তাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চা খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ১৭৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ হাজার ১৩৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। বকেয়া ঋণ ১ হাজার ৮২৬ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণ ২১৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ৫১৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

আর্থিক চাপ কমাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া চা উৎপাদন ও বিনিয়োগে সহায়তা দিতে ৬ শতাংশ সুদে একটি আবর্তক তহবিল গঠনের প্রস্তাব এসেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮ হাজার কোটি টাকার আবর্তক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি থেকে ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। এ অর্থ থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ বার্ষিক সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন।

চা উৎপাদনে নেওয়া ঋণের সুদের হার বর্তমান ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে আনার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। ৬ শতাংশ সুদের আবর্তক তহবিল, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির বরাদ্দ এবং সুদের হার কমানোর প্রস্তাব পৃথক উদ্যোগ।

চা চাষকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব

চা চাষকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে উৎপাদকদের কৃষি খাতের রেয়াতি ঋণসুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ চা বোর্ড এ প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে, চা খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ কার্যক্রম চারা রোপণ, গাছের পরিচর্যা, ছাঁটাই ও পাতা সংগ্রহের মতো কৃষিকাজের অন্তর্ভুক্ত। বাকি ৪০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক। তবে জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২-এ চা প্রক্রিয়াজাতকরণকে শিল্প কার্যক্রম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করায় শিল্প মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটিতে আপত্তি জানিয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

চা বাগানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব

চা চাষের অনুপযোগী জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। এ জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বাগানের বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

গত ২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় চা কোম্পানিগুলোকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উৎপাদন বাড়ানো ও রপ্তানি সম্প্রসারণ

২০২৫ সালে দেশে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৫৫২ কেজি। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ চা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।

চা বাগানগুলোর মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৬ একর। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯১ একর চাষযোগ্য জমি। নার্সারিসহ ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৩৭ একর এবং ভবিষ্যতে চা চাষ সম্প্রসারণের জন্য অবশিষ্ট জমি ১৬ হাজার ৯২৮ একর।

অনেক বাগানের চা গাছের বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছর বা তার বেশি। নতুন গাছ লাগানোর অপর্যাপ্ততা, শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার তুলনায় কম উৎপাদনশীলতা চা উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রথমে দেশের চাহিদা পূরণ এবং এরপর রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উৎপাদন ও চায়ের গুণগত মান বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিদেশের বাজার অনুসন্ধানে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করেছে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার কেজি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি আয় হয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

রপ্তানি বাড়াতে অর্থোডক্স ও বিশেষায়িত চায়ের উৎপাদন, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং, বিপণন এবং আন্তর্জাতিক মানসনদ অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে দক্ষতা বাড়াতে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

চা খাতের উন্নয়নে প্রতিটি বাগানের সমস্যা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ চা বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *