আজ ১৬ অক্টোবর, বঙ্গভঙ্গ দিবস। ১৯০৫ সালের এই দিনে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলো। নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী করা হলো ঢাকাকে। দীর্ঘ বিরতির পর আবার রাজধানীর মর্যাদা পেল শহরটি। এর এক বছর পর, ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগের ইশরাত মঞ্জিলে প্রতিষ্ঠিত হলো সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনই নেতৃত্ব দেয় পাকিস্তান আন্দোলনে। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গে জমিদারি ও মধ্যস্বত্ব বিলোপের আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র আছে। তবে সেই যোগসূত্র বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে আরও পেছনে।
মুঘল আমলে সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতি ১৬১০ সালে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। পরে রাজধানী চলে যায় মুর্শিদাবাদে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ঢাকাকে আবার একটি প্রদেশের রাজধানী করে তোলে। ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি ছিল, বিশাল বাংলা প্রদেশকে ভাগ করলে প্রশাসন পরিচালনা সহজ হবে। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের প্রভাব প্রশাসনিক সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী আন্দোলনে নামে। গড়ে ওঠে স্বদেশি আন্দোলন, শুরু হয় ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের কর্মসূচি। তবে এই বিরোধিতার পেছনে সবার উদ্দেশ্য এক ছিল না। কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত ও প্রভাবশালী শ্রেণির রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ, সবই আলোচনায় আসে। ইতিহাসবিদ জন আর. ম্যাকলেনের বিশ্লেষণে, ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক যুক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। কলকাতার প্রভাবাধীন বাঙালি রাজনীতিকদের দুই প্রদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সেই হিসাবের অংশ ছিল। তবে বঙ্গভঙ্গের মূল উদ্দেশ্যই হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা করা ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্বের একটি অংশ বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল। তাদের কাছে ঢাকায় প্রাদেশিক রাজধানী প্রতিষ্ঠা মানে ছিল নিজেদের অঞ্চলের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম। নবাব খাজা সলিমুল্লাহ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শুরুতে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের স্থায়িত্ব ছিল না। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেওয়া হয়; ১৯১২ সালে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্বের একটি অংশ হতাশ হয়। ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে তা ধাক্কা খায়। তবে এই একটি ঘটনাই মুসলিম লীগের পরবর্তী রাজনীতিকে নির্ধারণ করেনি। সময়ের সঙ্গে সংগঠনটির অবস্থান বদলেছে। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব এবং ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার অবসানের দাবি উঠেছিল। ১৯৩৮ সালে স্যার ফ্রান্সিস ফ্লাউডের নেতৃত্বে গঠিত ভূমি রাজস্ব কমিশন জমিদারি ব্যবস্থা বিলোপের সুপারিশ করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গে সেই দাবির আইনি বাস্তবায়নের পথ এগোয়। পূর্ববঙ্গের State Acquisition and Tenancy Act ১৯৫১ সালের ১৬ মে অনুমোদিত হয়। এই আইনের মাধ্যমে জমিদার ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীর রাজস্ব আদায়ের অধিকার অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
জমিদারি ব্যবস্থার অবসানে ভূমি ও রাজস্ব আদায়ের পুরোনো কাঠামো বদলে যায়। কিন্তু জমিদারি বিলোপ আর ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণব্যবস্থার বিলোপ এক বিষয় নয়। একইভাবে, জমিদারের অধীনে থাকা প্রজা থেকে নাগরিক হয়ে ওঠার ধারণাটিও শুধু একটি আইনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক অধিকার, প্রতিটি পরিবর্তনের নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে।
বঙ্গভঙ্গ ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী করেছিল। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ পরে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গে জমিদারি বিলোপের আইনি প্রক্রিয়াও এগিয়ে যায়। ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু একটির ফলেই অন্যটি ঘটেছে, এমন সরল ব্যাখ্যা ইতিহাসের জটিলতা ধরতে পারে না। এই ধারাবাহিকতা বুঝতে হলে দেখতে হবে, সময়ের সঙ্গে কার হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা গেছে, কোন শ্রেণির স্বার্থ বদলেছে, আর সাধারণ মানুষের অধিকার কতটা পরিবর্তিত হয়েছে।